English
শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০
...

সাইক্লোন আম্ফান: দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি

সাইক্লোন আম্ফান

ঢাকা, ২০ মে ২০২০, বুধবার: বাংলাদেশের ওপর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সাইক্লোন আম্ফান নিয়ে সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠার শেষ নাই। এই সাইক্লোনের প্রভাবে দেশের বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসন যথেষ্ট আস্থার সাথে মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা: আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে এই জেলার ৭টি উপজেলা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। এই জেলায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের ঘোষণা করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জেলার মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে আম্ফান এখনো প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তাই পূর্ববর্তী ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের স্থলে এখন ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলার ৭টি উপজেলায় ১৪৭টি সাইক্লোন শেল্টার ও ১ হাজার ৭৯৬টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বিকল্প আশ্রয়কেন্দ্র সমূহে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল। আরো যে সকল জনসাধারণ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি, তাদেরকে মাইকিং করে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালনার পাশাপাশি সেল্টারে যাবার অনুরোধ জানাচ্ছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, সাতক্ষীরার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের সময়ের চেয়ে থেকে ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত অধিক উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের সম্ভবনা রয়েছে। আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত এ জেলার কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় হালকা বাতাস কিন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হলেও এরপর বৃষ্টিপাতের সাথে বাতাস জোরালো হয়।

বাগেরহাট জেলা: আজ সকাল হতেই এ জেলায় জোরালো বাতাস সহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। সাইক্লোনের ভয়াবহতার আভাসের পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে সামাজিক নিরাপদ দূরত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সরাসরি তত্বাবধানে আজ দুপুরের মধ্যে ৯৯৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৫০ জন মানুষকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন কতৃপক্ষ।

বাকি যেসব মানুষজন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করেন তাদেরকে সেল্টারে আশ্রয় নিতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসন। আশার কথা, আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে সবার হাতধোয়ার ব্যবস্থা এবং সৌর বিদ্যুত সরবরাহের সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া রাতের বেলা শুকনো খাবার এবং রোজদারদের জন্য রয়েছে সেহেরির আয়োজন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এ জেলায় পূর্বে মাত্র ৩৪৫টি স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র ছিল, এবার এরসাথে আরো ৬৫২টি আশ্রয় কেন্দ্র বাড়িয়ে মোট ৯৯৭টি করা হয়েছে। আর এসব গুলো আশ্রয় কেন্দ্রে সর্বমোট ৬ লাখ ধারণ ক্ষমতা থাকলেও করনাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ৩ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব হবে।

বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্রসমূহে সতর্ক লোকজন পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি নিজেদের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি সহ অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে প্রশাসন করোনার ব্যাপারে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করে চলেছে।

সরকারী ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় ২০০ টন চাল, নগদ ৩ লাখ টাকা, ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য, গো-খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ করেছে সরকার। আর দূর্যোগকালীন স্বাস্থ্য সেবার জন্য এ জেলায় ৮৫টি মেডিকেল টিমসহ ১১ হাজার ৭০৮ জন স্বেচ্ছাসেক প্রস্তুত রয়েছেন।

এদিকে, বাগেরহাট জেলার পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিশ্ব-ঐতিহ্যের অন্যতম সুন্দরবন এলাকার মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৭টি স্টেশন অফিস ও টহল ফাঁড়ির সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে পার্শ্ববর্তি বন অফিসে সরিয়ে নেয়ার যাবতীয় বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে: চরখালী, শ্যালা, জোংলা, কচিকালী, শুয়ারখালী, তাম্বুলবুনিয়া ও জাপসী ফরেস্ট অফিস।

এ ছাড়া বনবিভাগে কর্মরত সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে সাইক্লোনের দূর্যোগের মোকাবেলায় সতর্ক থাকার জন্য... সবিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জানা যায় সুন্দরবনে সরকারীভাবে অনুমোদিত নিয়মিত মাছ ধরা পেশাজীবী প্রায় হাজার দুয়েক জেলেদের মধ্যে প্রায় দুইশতের মত সময়মত বাড়ী ফিরে যেতে না পারার কারণে তাদেরকে বনবিভাগের বিভিন্ন অফিসে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারির পর বন্দরের জেটি ও বহিনোঙ্গরে অবস্থানরত ১১টি বিদেশী জাহাজের পণ্য খালাস ও বোঝাই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। আর বন্দর কতৃপক্ষ নিজস্ব নৌযানগুলোকে নিরাপদে রাখার বন্দোবস্ত করেছে। এছাড়া সাইক্লোন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সজাগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ভোলা জেলা: জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ আলম সিদ্দিক সাইক্লোন মোকাবেলায় যথেষ্ট তৎপর রয়েছেন। জানা যায়, দুর্যোগ দূর্গত মানুষদের জন্য এ জেলায় রয়েছে ১ হাজার ৪টি আশ্রয় কেন্দ্র। এতে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫০৯ জন মানুষ এবং তাদের গৃহপালিত ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৩৮টি পশুকে থাকার ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন।

গতকাল থেকেই বিচ্ছিন্ন ২১টি চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদে নিয়ে আসার ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেন জেলা প্রশাসক। জীবনু নাশক স্প্রে ছিটিয়ে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে আশ্রয় কেন্দ্র গুলো স্বাস্থ্য সম্মত করা হয়েছে।

এ জেলার মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলার ১১টি গ্রামে প্লাবনের পানিতে সয়লাব। অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে মনপুরা উপজেলায় ভেড়ি বাঁধের বাইরে ৬টি গ্রামও প্লাবিত হয়েছে। সাইক্লোন আঘাত হানার পর এ এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনিত ক্ষয়-ক্ষতি ও নানা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন জেলা প্রশাসক। দূর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসারসহ সকল আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

আশ্রয় কেন্দ্রে ইফতারি, রাতের খাবার ও সেহেরীর সহখাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। শিশু, বয়স্ক, মহিলা, গর্ভবতী ও অন্যান্য অসহায়দের উদ্ধারকাজে এবং স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য রয়েছে নিয়োজিত আছে ৭৯টি মেডিকেল টিম। প্রত্যেকটি উপজেলাতেও মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ত্রাণ হিসেবে এ জেলায় প্রাথমিকভাবে ৭ লাখ টাকা, ২০০ মে. টন চাল ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর জেলা: রামগতি, রায়পুর ও কমলনগরের উপকূলীয় চর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য জোরালো ভূমিকা পালন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল হতে বৃষ্টিপাতের কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও ওষুধ জোগাড় করা হয়েছে। এ জেলার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ১০১টির সাথে ১৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যোগ করে সর্বমোট ২৫২টি সেল্টার প্রস্তুত করেছে জেলা প্রশাসন। আর এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার মানুষ তাদের ২ হাজারেরও বেশি গবাদিপশুসহ আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পালের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ৬৬টি মেডিকেল টিম এখন কর্মব্যস্ত রয়েছে।স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে রেডক্রিসেন্ট কর্মী ২২০০ জন এবং সিপিপি কর্মী রয়েছেন ২৪৭৪ জন। জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নগদ সাড়ে ১৯ লাখ টাকা ও ৪৯৫ টন চাল বরাদ্দ করেছে। এরমধ্যে শিশু খাদ্যের জন্য ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং ১ লাখ টাকা গবাদিপশু খাদ্যের জন্য বরাদ্দ করেছে।

জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পালের ব্যবস্থাপনায় জেলার দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দূর্গত মানুষদের সার্বিক সহায়তা প্রদানসহ যেকোন জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ০১৭৩৫০০৩৫৫৫ ও ০১৮১৯৫২৪৮০২ এই দুইটি মোবাইল ফোন নম্বর সহ ২৪ ঘণ্টা হটলাইন চালু করা হয়েছে।




মন্তব্য

মন্তব্য করুন