বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বেইজিংয়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেছে ঢাকা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বৈঠকে লিউ হাইশিয়াং বাংলাদেশের বক্তব্য ও প্রত্যাশা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বৈঠকেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় চীনের কূটনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়। এ ছাড়া দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে এগোয়নি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাখাইন রাজ্যের সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা এ উদ্যোগের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের কারণে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবিক সহায়তার চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ থাকায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশটির কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে প্রত্যাবাসন টেকসই করতে হলে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের অধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের প্রত্যাশা, চীনের কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব হবে। দীর্ঘদিনের এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হলে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং বাংলাদেশও দীর্ঘদিনের মানবিক ও আর্থসামাজিক চাপ কমিয়ে আনার পথ খুঁজে পাবে।